বাংলা রচনা
সমগ্র
সমাজ জীবনে দুর্নীতি
(সংকেত: ভূমিকা; দুর্নীতি কি; দুর্নীতির প্রকৃতি; দুর্নীতির কারণ; সমাজজীবনে দুর্নীতি; বাংলাদেশে দুর্নীতির ক্ষেত্রসমূহ; দুর্নীতির প্রতিক্রিয়া; দুর্নীতি দমন আইন ও দুদক; দুর্নীতি প্রতিরোধের উপায়; উপসংহার।)ভূমিকা: সমাজের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাধি হলো দুর্নীতি। বর্তমানে সারা বিশ্বজুড়েই দুর্নীতিকে মারাত্মক সামাজিক সংকট ও সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর, প্রতিটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আজ দুর্নীতির শিকার। কোনো সমাজকে কলুষিত করে তাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে দুর্নীতি যেন বদ্ধপরিকর। সেই ১৭৫৭ সালে মীরজাফরের দুর্নীতি আর বিশ্বাঘাতকতার কারণে আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের স্বাধীনতা। আজ এত বছর পরে আবারও আমাদের স্বাধীনতার সুফলকে আড়াল করছে আমাদেরই গড়া দুর্নীতির পাহাড়। তাই স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হয়েও নিজেদের দুর্নীতির কারণে আমরা তলিয়ে যাচ্ছি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, হতাশা আর সামাজিক সংকটের অতল সমুদ্রে।
দুর্নীতি কী: সাধারণভাবে দুর্নীতি হলো যেকোনো নীতি বিরুদ্ধ কাজ। মানুষ যখন তার ন্যায়নীতি, আদর্শ আর মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে, আইন অমান্য করে কোনো কাজ করে তখন তাকে দুর্নীতি বলে। মানুষ তার ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত স্বার্থকে হাসিলের উদ্দেশ্যে নিজের নীতিকে বিসর্জন দিয়ে যে কর্মকান্ড করে সেগুলোই দুর্নীতি। বিশ্বব্যাংকের মতে- ‘ব্যক্তিগত লাভ বা গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার হলো দুর্নীতি।’ অন্যভাবে বলা যায়, দুর্নীতি হলো মানুষের এমন ব্যবহার যা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে কোনো বিশেষ দায়িত্বে মনোনীত বা নির্বাচিত ব্যক্তিকে তার কাজ যথাযথভাবে করা থেকে বিরত রাখে।
দুর্নীতির প্রকৃতি: দুর্নীতির প্রকৃতি কিংবা প্রকারকে আমরা তিনটি দিক থেকে দেখতে পারি। প্রথমত, ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের দুর্নীতি। দ্বিতীয়ত সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারিদের দুর্নীতি। তৃতীয়তঃ বেসরকারি দুর্নীতি। একটি প্রবাদ আছে- ‘যে লঙ্কায় যায়, সেই রাবণ হয়।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি ক্ষমতা হাতে পায় সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা সবাইকে তাদের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সকলের ওপর তাদের কর্তৃত্ব থাকে। তাই তারা নির্বিঘ্নে দুর্নীতি করতে পারে। তাদেরকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। অন্যদিকে যারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি তারাও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি করে। প্রাচীন অর্থশাস্ত্রের লেখক কৌটিল্য বলেছেন-জিহ্বার ডগায় মধু/বিষ রেখে সেটার স্বাদ কেউ নেবে না এমন যেমন হয় না, তেমনি সরকারি তহবিল যার দখলে থাকে সেও তা আত্মসাৎ করবে না এমনও হয় না। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দুর্নীতির বাইরে যে সমস্ত দুর্নীতি হয় সেগুলো হলো বেসরকারি দুর্নীতি। এসব দুর্নীতি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘটে থাকে। যেমন কারো জায়গা জমি, অর্থ আত্মসাৎ করা, প্রতারণা করা ইত্যাদি।
দুর্নীতির কারণ: যখন কোনো দেশ ও সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, মানুষের মধ্যে নীতি নৈতিকতার অভাব হয় তখন দুর্নীতি হয়। সমাজে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে এককভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত এবং তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এককভাবে ক্ষমতা প্রাপ্ত হলেও সেখানে দুর্নীতি হয়। সমাজে জবাবদিহিতার অভাব থাকলে এবং রাষ্ট্রীয় কাজে কিংবা যেকোনো সাধারণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বেতন যখন পর্যাপ্ত নয় সেখানে দুর্নীতি হয়। দেশের শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ দুর্বল হলে এবং সেখানে কোনো স্বচ্ছতা না থাকলে মানুষ দুর্নীতি করে। আবার যে সমাজে স্বাধীন-গণমাধ্যম থাকে না, সক্রিয় একটি সুশীল সমাজ থাকে না সেখানেও দুর্নীতি অনেক বেশি হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধী সঠিক ও কার্যকরী আইনের প্রয়োগের অভাবেও দুর্নীতি হয়। এছাড়া মানুষের দারিদ্র্য আর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাও দুর্নীতির অন্যতম কারণ।
সমাজজীবনে দুর্নীতি: সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এখন সমাজের প্রত্যেক স্তরে প্রবেশ করেছে। তাই আজ প্রায়শই দেখা যায় একটি শিশু বেড়ে ওঠে তার বাবা মায়ের দুর্নীতির টাকায়। এরপর সে একটি স্কুলে ভর্তি হয়। হয়তো সেখানেও তাকে পড়তে হয় ডোনেশনের আড়ালে ঘুষের দুর্নীতিতে। তারপর সে পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ফাস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রের সুবাদে খুব ভালো ফলাফল করে। একই উপায়ে হয়তো ভর্তি হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। হয়তো ভালো নম্বর কিংবা বাড়তি কোনো সুবিধা পাবার আশায় সে বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক কিংবা অফিস কর্মচারিদের সাথে দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়। এরপর সে প্রবেশ করে কর্মজীবনে। তাও হয়তো মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে। এই যে দুর্নীতির চক্রে দুর্নীতির সংস্কৃতিতে সে বড় হয়ে ওঠে তাতে করে তার জীবনে দুর্নীতি স্থায়ী রূপ লাভ করে। সে প্রতিষ্ঠিত হয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে। একসময় সে নামে রাজনীতিতে। দেশ সেবার আড়ালে সে তখন আত্মসাৎ করে জনগণের টাকা, দখল করে সরকারি সম্পদ। ফলে দেখা যাচ্ছে পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই মানুষ দুর্নীতিতে আক্রান্ত ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশে দুর্নীতির ক্ষেত্রসমূহ: বাংলাদেশে দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো হলো-
দুর্নীতি দমন আইন ও দুদক: দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের জন্য অন্যান্য অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন রয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭’ ও ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৫৭’ আমাদের দেশে প্রচলিত। প্রথম আইনটি কেউ যেন দুর্নীতিতে জড়িত হতে না পারে সে জন্য করা হয়েছে। এতে দুর্নীতির জন্য শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। পরের আইনটি দ্বারা অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দুর্নীতিগ্রস্তদেরকে চিহ্নিত করা ও শাস্তি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন আইন ২০০৩ এর প্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে গঠিত হয় দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন অর্থাৎ দুদকের পুনর্বিন্যাস করা হয়।
দুর্নীতি প্রতিরোধের উপায়: দেশ ও সমাজের উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে হলে দুর্নীতিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আর এজন্য নিতে হবে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ। যেমন -
No comments:
Post a Comment